Blogs

স্মৃতিপটে ৪২০: স্বপ্ন বুনুনের আঁতুড়ঘর

মোঃ রওশন আলী (অয়ন)

ব্যাচ: জিইবি-১৭

পিএইচডি গবেষক, The University of Texas at Austin, Texas, USA

 

শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন সবাইকে। 

আমার প্রাণের বিভাগ-জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের প্রথম এলামনাই পুনর্মিলনী উপলক্ষে যে স্মরণিকা প্রকাশিত হতে যাচ্ছে, সেখানে নিজের অনুভূতি ভাগাভাগি করার সুযোগ পেয়ে আমি ভীষণ আনন্দিত।

      আমি জিইবি১৭ ব্যাচের ২০১২২০১৩ শিক্ষাবর্ষের একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী।২০১৩ সালের পহেলা জানুয়ারির এক কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের সকালে তৃতীয় বিজ্ঞান ভবন (বর্তমানে স্যার জগদীশচন্দ্র বসু অ্যাকাডেমিক ভবন) এর চতুর্থ তলার ৪২০ নম্বর কক্ষে আমার এই বিভাগে পথচলা শুরু। মজার বিষয় হলো, এই একই ৪২০ নম্বর কক্ষেই আমার ভর্তি পরীক্ষা হয়েছিল। আবার সেই কক্ষেই নবীনবরণ, বিভাগের সকল বর্ষের বার্ষিক পরীক্ষা, স্নাতক প্রজেক্ট ডিফেন্স, এমনকি বিদায় অনুষ্ঠান পর্যন্ত। বিভাগের সাথে পথ চলতে চলতে এই কক্ষের সাথে হয়ে ওঠে এক আত্মিক সম্পর্ক।বিভাগের শুরু থেকে আজ অবধি কতশত ছাত্রের  কত নতুন স্বপ্নের বীজ বপিত  হয়েছে কিংবা সপ্নভঙ্গের সাক্ষী হয়েছে এই ৪২০। কত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলা, প্রতিযোগিতা, গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারের শেষ আশ্রয়স্থল ছিল এই ৪২০। সেমিনার শেষে সেই একটি সিঙ্গারা, এটিও ছিল আমাদের আরেক আনন্দের কেন্দ্র! ৪২০ শুধুমাত্র একটি কক্ষ নয়, এটি আমাদের হৃদয়ের গভীরে রোপিত এক ঐতিহ্য, যা প্রত্যেক জিইবি শিক্ষার্থীর জীবনে থেকে যায় আজীবন।

      স্নাতক সম্পন্ন করার পর খুব বেশিদিন আর এই ৪২০ এর সাথে পথ চলা হয়নি আমার। উচ্চতর জ্ঞান অর্জনের ফেরিওয়ালা হয়ে পাড়ি জমিয়েছিলাম সুদূর চীন দেশে। University of Science and Technology of China (USTC)– থেকে মাইক্রোবায়োলজিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করি। এরপর অতলান্তিক পাড়ি দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। বর্তমানে, আমি The University of Texas at Austin-এ পিএইচডি গবেষণায় নিয়োজিত। আজ আমার  বলতে দ্বিধা নেই , আমার সত্যিকারের উচ্চশিক্ষার বীজ বপিত হয়েছিল এই ৪২০ নম্বর কক্ষেই।বিভাগের মতবিনিবয় সভা,  এবং অগ্রজদের গবেষণালব্ধ ফলাফল উপস্থাপন ছিলো অনুপ্রেরণার মূল উৎস। জীবনের পথ যত দূরেই নিয়ে যাক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতিহারের সেই সবুজ চত্বর,  প্যারিস রোড, তৃতীয় বিজ্ঞান ভবন, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগ, আর অবশ্যই  সেই ৪২০ নম্বর কক্ষ আমার পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।

      তিনটি ভিন্নদেশে পড়বার সুবাদে, বহু বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফারেন্স রুমে বসবার  সুযোগ হয়েছে-এমনকি MIT, Harvard, Boston -এর প্রাঙ্গণেও ঘুরে দেখেছি, কিন্তু মন আমাকে বারবার ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই ৪২০-এ, মতিহারের সেই আপন পরিবেশে। আজ প্রায় ৮ বছর হলো ৪২০-তে যাওয়ার সুযোগ মেলেনি।আমার শূন্যতা আরও আগেই পূরণ হয়েছে নতুন নতুন অনুজদের আগমনে।কিন্তু আমার হৃদয়ের স্মৃতিপটে আজও তুমি অমলিন, তোমার শূন্যতা অপূরণীয়। আজও হয়তো বিভাগের অনুজদের কোলাহলে আনন্দে মুখরিত হয় সেই ৪২০। এখনও  হয়তো সেখানে বিভাগের সেমিনার, পরীক্ষা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নবীনবরণ কিংবা বিদায়ের সাক্ষী হয়,  হয়তো এখনো নতুন কোনো ভোরে নতুন স্বপ্নের বীজ বপিত  হয়।এভাবে  ৪২০ বেঁচে আছে-প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে হৃদয়ের খুব সন্নিকটে, আমাদের বিভাগের গর্ব বহন করে।এখান থেকে গঠিত মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ, সাংগঠনিক শিক্ষা ও শিকড়ের টানে কাজ করার অনুপ্রেরণা  আমার সারা জীবনের সঞ্চয়ন হিসেবে থাকবে।আমরা সম্প্রতি উত্তর আমেরিকাতে আমাদের বিভাগের  ৪২০ নম্বর কক্ষের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের নিয়ে এলামনাই সংগঠন, RU GEB Association in North America (www.rugebana.org) নিয়ে কাজ করছি ৪২০ নম্বর কক্ষের প্রাক্তন শিক্ষার্থীর সংখ্যা  হয়তো  উত্তরোত্তর আরও বৃদ্ধি পাবে আমাদের এলামনাই তে।

     মতিহারের সবুজ চত্বর থেকে সাড়ে আট হাজার মাইল দূরে থাকলেও উদাস মনে এখনও হারিয়ে যাই আমাদের প্রাণের বিভাগ, এবং বিভাগের  ৪২০ নম্বর কক্ষে, আজও মন হেঁটে চলে ৪২০ নম্বর কক্ষের সামনের লম্বা করিডোরে, বসে থাকি  কক্ষের  কোনো এক চেয়ারে, পরিচিত কাউকেই চোখে পড়ে না, হঠাৎ অপরিচিত কেউ একজন জিজ্ঞেস করে উঠে, “Are you lost?” আমি মৃদু হেসে বলি-, “This is exactly where my heart has always belonged.”

 

(বিশেষ দ্রষ্টব্য:  উপরোক্ত লেখাটি স্থান সংকলন না হওয়ায় কিংবা ছাপার অযোগ্য বিবেচনায় কিংবা কর্তৃপক্ষের গাফিলতির জন্য কিংবা উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে জিইবি এলামনাই ও পুনর্মিলনীর স্মরণিকাতে ছাপানো সম্ভব হয়নি। তথাপি, উক্ত লেখাটি কোন পরিমার্জন ছাড়াই RU GEB Association in North America এর ওয়েবসাইটে ব্লগ হিসেবে লেখকের অনুরোধে  এখানে প্রকাশিত হলো।)